রমজানে মুমিনের করণীয়

মহান আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতসমূহের মধ্যে অন্যতম নেয়ামত হল রামাদান। নবীজি হাদিসে এই পবিত্র মাসকে উম্মতের মাস বলেছেন। গভীর উপলদ্ধি করলে বুঝবেন কেন উম্মতের মাস বলা হয়েছে। কারণ, এতে ইবাদাত, রূহানীয়াত, আধ্যাত্মিকতা ও দান সদকাসহ যাবতীয় কল্যাণকর দীনি কাজ সংগঠিত হয়, যা অন্য ১১ মাসে হয়
না। যেমন- মানুষ, দানে মরিয়া হয়ে উঠে এই মাসে। ইবাদতে বিশেষ মনোযোগ দেয় এই মাসে; এছাড়া অারো অনেক কিছু। তাই একজন মুমিন মুসলমানকে রামাদানে যেসব কাজ করতে হবে এর গুরত্বসহ নিম্নে বর্ণনা করছি।

পবিত্রতা ও নিয়্যত: প্রথমেই আপনাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পবিত্র হয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। নিজের ঘর/বাসা পরিষ্কার করবেন। জামা পরিষ্কার করবেন। অাগে থেকে ছোট-বড় কাজ ও লেনদেন সম্পন্ন করবেন। যাবতীয় ছোট-বড় দৃশ্যমান পাপকাজ থেকে মুক্ত থাকার নিয়্যত করবেন। যাদেরকে ইফতার-সাহরির খাবার দিতে হয় দিয়ে দিবেন। যাকাত ও দানের অর্থ হিসাব করে রেখে দিবেন রামাদানের শেষ দশকে দানের জন্য। এরপর চাঁদ উদিত হলে আল্লাহ্’র কাছে এই পূর্ণ রামাদানে সুস্থ থাকার জন্য, সব রোজা পালন করার জন্য এবং কল্যাণের জন্য দোয়া করবেন। রামাদানের রোজা পালনের নিয়্যত করবেন। অবশ্য মনে রাখবেন, আপনাকে প্রতিটা রোজা পালনের অাগেই প্রতিবার নিয়ত করতে হবে।

খতমে কুরআন ও তারাবীহ্: নবীজির উসিলায় আমরা পবিত্র কুরআন পেয়েছি। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ  নিজের ও পরিবারের কল্যাণে উম্মতের মাসে  অন্তত একবার হলেও কুরঅান খতম করবেন। পারলে  তারাবীহতেও এক খতম শেষ করতে পারেন। অনেকে সুরা তারাবীহ আদায় করেন। তারাবীহ জামাত সহকারে অবশ্যই বিশ রাকাতই  অাদায় করবেন। এটার উপর প্রত্যেক যুগে নবীজির উম্মতের ঐকমত্য (ইজমা) ছিল। বিশ রাকাত তারাবীহ্ এর প্রচলন করেন হযরত উমর (রা.)। নবীজির সাহাবীগণ অামাদের যে পথ দেখিয়েছেন সেই পথেই কোন বিতর্ক ছাড়াই অামরা চলব। আর দীর্ঘক্ষণ তারাবীহ্ তে কুরআন শ্রবণে ইবাদতের প্রতি গভীর মনোনিবেশ ও প্রশান্তি লক্ষ্য করা যায় এবং এতে শ্রবণের জন্য অধিক পূণ্য হাসিল হয়। এজন্য এর নামকরণ তারাবীহ্ করা হয়েছে।

রাতের ইবাদত ও সাহরি: অনেকেরই দিনে চাকরি, কাজ ও ব্যবসার কাজে যেতে হয়। তাই ধীরস্থিরভাবে ইবাদতের উত্তম সময় হল রাতে। তারাবীহ্ শেষ করে অল্প ডিনার করে কিছুক্ষণ হাটবেন। এটা শারীরিক সুস্থতার জন্য জরুরি। এরপর শুদ্ধ করে কুরআন তিলাওয়াত করবেন মনোযোগ সহকারে।  কয়েকঘণ্টা ঘুমিয়ে সাহরি গ্রহণের ১ ঘণ্টা অাগে উঠে তাহাজ্জুদ তথা নফল নামাজ আদায় করার চেষ্টা করবেন। দ্রষ্টব্য, পাচঁ ওয়াক্ত নামাজের নফল ও সুন্নাতে যায়িদাহ্ আদায়ের চেষ্টা করবেন। সাহরি গ্রহণ করে রোজার নিয়ত করে কিছুক্ষণ হাটবেন। এরপর নামাজ শেষ করে দরূদ ও জিকির পাঠ করে ঘুমাবেন পরিমাণমত।

দিনের বিশেষ কাজ ও ইফতার: দিনে যাদের
বিশেষ কোন কাজ নেই তারা দীনি পূণ্য  কাজে অংশগ্রহণ করতে পারেন। যেমন- আপনি যদি শুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াতে দুর্বল হন তাহলে একজন  কারী/হাফেজ থেকে অথবা অনলাইন কোর্স করে  বিশুদ্ধ কুরঅান তিলাওয়াত চর্চা করতে পারেন। যদি সহিহ ইসলামি আকিদার (সুন্নি) উপর স্টাডি করতে চান তাহলে  মাওলানা সাইফুল আজম আজহারীর অনলাইন আকিদা কোর্সটি করবেন। বিশেষত যারা ইসলামকে গভীরভাবে জানতে চান তারা কুরআনের বিশুদ্ধ অনুবাদ গ্রন্থ কানযুল ঈমান পড়ুন। এটা থেকে আপনি বাংলায় সহজ তাফসিরসহ পড়ে উপলদ্ধি করে আনন্দিত হবেন। এর পাশাপাশি ইসলামিক স্কলারদের ও বিখ্যাত মুসলিম মনীষীদের বই পড়তে পারেন। যারা কম পড়েন তারা গ্রহণযোগ্য আলেমদের ওয়াজ ও লেকচার শুনুন। মিডিয়া ও অনলাইনে ইসলামি গজলগুলো শুনুন। এটা আপনার ডিপ্রেশন আত্মার অশান্তি দূর করবে।
রামাদানের কিছুদিন গত হলে আপনি শূন্যতা অনুভব করবেন। এটা সঙ্গতার শূন্যতা। এসময় কাছের মানুষগুলোকে ইফতারের দাওয়াত করুন অথবা তাদের কাছে যেয়ে ইফতারে অংশগ্রহণ করুন। কখনো এতিম ও শিশুদের সাথে ইফতার করুন। ইন শা আল্লাহ্, আপনার শূন্যতা কেটে যাবে। ইফতার মেনুতে প্রতিদিন মিষ্টান্ন রাখুন। এটা আপনার ক্ষুধা দ্রুত নিবারণ করবে। ইবাদতে মনোযোগ দিতে সামান্য ইফতার করুন। অলসতা ও ঘুমভাব কাটাতে দুধের চা পান করুন।

যিয়ারত ও ভাবনা: কয়েকদিন পরপর পূর্বপুরুষদেরকে স্মরণ করতে তাদের কবর যিয়ারত করুন। এটা আপনার তাকওয়া আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। আর যখন আপনি পূত-পবিত্র অবস্থায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণা অনুভব করবেন আসরের সময়ে, তখম পশ্চিমাকাশে সূর্যের দিকে তাকিয়ে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলকে স্মরণ করে কিছু একটা অনুভব করুন। আপনার ঐ সময় মনে হবে আপনি যেন কিয়ামতের দিন অসহায় ও নিরুপায় হয়ে নবীজির দিকে তাকিয়ে আছেন এখন। আর নবীজি আপনার জন্য সুপারিশ করে জান্নাতের নহরের পবিত্র পানি পান করাচ্ছে আপনাকে। এসময় আপনার আধ্যাত্মিকতার উন্নতি হবে ও ধৈর্যের কারণে আল্লাহ-রাসুলের সন্তুষ্টি লাভ করবেন।

ই’তিকাফ: এটার উদ্দেশ্য ও মূল স্পিরিট হল- এর মাধ্যমে মহল্লার সবার পক্ষ থেকে কয়েকজন আল্লাহ্’র বিশেষ নৈকট্য ও সন্তুষ্টি হাসিল করুক এর মাধ্যমে মহল্লায় প্রভুর রহমত ও নেয়ামত বর্ষিত হোক। সারা বছর মহল্লার মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করুক। তাই চেষ্টা করবেন নিজেকে জীবনে একবার হলেও মুতাকিফ বানাতে। বিশেষত যারা পরিবারকে রেখে চিল্লায় যান তারা এসব না করে ইতিকাফ করুন। এটা অনেক সহজ ও পূণ্যের কাজ।

যাকাত ও দান-সদকাহ্: রামাদানের শেষ দশকে হিসাব করে যাকাতের অর্থ যাকাতের হকদারকে গোপনে প্রদান করুন। আর আপনার উপর যদি যাকাত ফরজ না হয় তাহলে আপনি প্রতিদিন কম-বেশি দান করুন। কোন কেউ যেন খালি হাতে না ফিরে। এমনকি কেউ সহযোগিতা চায়লেও দেওয়ার চেষ্টা করুন। এটা বিশেষ নম্রতা ও দরদ।এটার দ্বারা মুমিনের মোম হৃদয়ের দৃশ্য দেখায়।
কেন শেষ দশকে যাকাত ও দানের কথা বললাম? কেননা এ সময়টাতে গরীবের প্রয়োজনীয় দ্রব্য ফুরিয়ে আসে এবং তারা তা পূরণের জন্য ও ঈদের কেনাকাটার জন্য সাহায্যের লাভের অপেক্ষায় থাকে।

পরিশেষে, আল্লাহ’র কাছে বিশেষ দোয়া করবেন নিজের ও মানবজাতির জন্য, যাতে আল্লাহ্ এই রামাদানের উসিলায় করোনা মহামারী থেকে অামাদের সবাইকে মুক্ত করে সবার সর্বস্তরের সংকট
নিরসন করেন এবং দেশের শান্তি ও জনকল্যাণ দান করেন। মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে ৩০ টি রোজা সম্পন্ন করার শক্তি দান করুন। আমিন।

– মুহাম্মদ আসিফ খান
শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Email: asif34join@gmail.com

নিউজটি শেয়ার করুন
Total Page Visits: 623 - Today Page Visits: 11

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *